তুহিন ভক্তদের তোপের মুখে শিরোনামহীনের সদস্যরা

জনপ্রিয় ব্যান্ডদল শিরোনামহীনের সঙ্গে আর নেই দলটির ভোকাল ও জনপ্রিয় সদস্য তুহিন। এ নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে গেল কয়েকদিনে। নানা ইস্যুতে বিষয়টি চাপা পড়ে থাকলেও ব্যান্ড সংগীতের শ্রোতারা ঠিকই নিজেদের আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কেউ কেউ অনুরোধ করেছেন সব ঝামেলা মিটিয়ে আবারও তুহিনকে নিয়েই ফিরে আসুক শিরোনামহীন।
তবে তুহিন এবং তুহিন বিহিন শিরোনামহীন; এই দুই পক্ষে বিভক্ত এখন দলটির শ্রোতা-ভক্তরা। বলার অপেক্ষা রাখে না এই পক্ষপাতিত্বের দাড়িপাল্লায় তুহিনের দিকেই ওজনটা বেশি। আর তারই প্রমাণ মিললো গতকাল শিরোনামহীনের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পেজের এক স্ট্যাটাসে।
সেখানে শিরোনামহীনের সদস্যরা তুহিনকে মানসিক রোগী দাবি করে তার মানসিক সুস্থতা কামনা করেন। সেইসঙ্গে দল ও দীর্ঘদিনের সদস্য বন্ধুদের উপর ক্ষোভ থেকে বলা তুহিনের কথার জের ধরে তুহিনের কঠোর সমালোচনা করা হয়। তারা বলেন, ‌‘শিরোনামহীন এর সদস্যরা বিশ্বাস করে - হৃদরোগ জনিত অসুস্থত থেকে বিষন্নতা এবং ঔষধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় তুহিন এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব এ আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পারেন। আমরা তার সর্বাঙ্গীন সুস্থতা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করি।’
আর তাতেই ক্ষেপেছেন তুহিন ভক্তরা। তারা বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, শিরোনামহীনের কানাকড়ি দাম নেই তাদের কাছে তুহিনের কণ্ঠ ছাড়া। তবে এইসব মন্তব্যের বিপক্ষে তুহিন বিহিন শিরোনামাহীনের কোনো ক্ষতি হবে না বলেও দাবি করেন কেউ কেউ। অনেকে আবার নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে তুহিনের সঙ্গে সব ঝামেলা মিটিয়ে শিরোনামহীনকে আবারও আগের মতো দুর্দান্ত হয়ে উঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
শত শত কমেন্টস দাতাদের তালিকায় আছেন আসিফ আকবরের মতো নন্দিত গানের মানুষ। আছেন শোবিজের নানা অঙ্গনের আরও অনেক তারকা। তাদের দাবি, কোন্দলের শিকার হয়ে ব্যান্ডদল ভেঙে যাওয়ার যে মন্দ সংস্কৃতি তা একেবারেই বেমানান শিরোনামহীনের সদস্যদের সঙ্গে। সেই সংস্কৃতি থেকে তারা বেরিয়ে আসুক।
ফেসবুকে শিরোনামহীনের দেয়া স্ট্যাটাসটি ছিলো- 
আমরা তুহিনের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা কামনা করি।
গত ২১শে সেপ্টেম্বর শিরোনামহীনের কণ্ঠশিল্পী তানযীর তুহিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয় এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি হয়। তার এনজিওগ্রাম রিপোর্ট প্রকাশের পর ডাক্তার তাকে দুমাসের বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং ব্যান্ড সংগীত চর্চা থেকে আপাতত বিরত থাকতে বলেন। শিরোনামহীন গত ৪ অক্টোবর ব্যান্ডের সকল সকল সদস্যের উপস্থিতিতে তানযীর তুহিনের বাসায়, তুহিনেরই পরামর্শে সর্ব সম্মতিক্রমে একজন অতিথি শিল্পী নিয়ে গানের প্র‍্যাক্টিস এবং তুহিনের সুস্থতার আগ পর্যন্ত স্টেজ পারফর্মেন্স চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
শিরোনামহীন সর্বদা ব্যান্ডের সকল সদস্যের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তুহিনের দ্রুত আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় তার বিশ্রামের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে। উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে তুহিনের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং প্রক্রিয়াধীন স্টেজ পারফর্মেন্স প্রস্তাবনা শিরোনামহীন অবিরত ফিরিয়ে দিয়েছে।
তুহিনের সহসা সিদ্ধান্ত, মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্কিত বক্তব্যে অন্য সবার মত শিরোনামহীনও হতবাক এবং দুঃখিত হয়েছে। যেখানে শিরোনামহীন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কন্সার্ট থেকে অর্জিত সম্মানি তুহিন অনুপস্থিত থাকলেও তার সাথে শেয়ার করার প্রস্তাবনা পর্যন্ত রেখেছিল, সেখানে ‘তাদের কাছে বন্ধুত্ব এর চেয়ে টাকা মুখ্য’ বক্তব্যটি শিরোনামহীনের সদস্যদের মর্মাহত করেছে।
উল্লেখ্য যে, তুহিনের প্রকাশিত সাক্ষাতকারে বিভিন্ন অসত্য তথ্য যেমন ১৯৯৬ সালে তুহিনের সংযুক্তি এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দাবী, ব্যন্ডের বেশীরভাগ গানই নিজের বলে দাবী করাটা শিরোনামহীনকে যারপরনাই বিস্মিত ও আহত করেছে। প্রকৃত সত্য এই যে, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শিরোনামহীন ব্যান্ডে তুহিন ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে যোগ দেয়। এছাড়া শিরোনামহীন এ প্রকাশিত ৫টি অ্যালবাম ও কতিপয় মিক্সড অ্যালবাম এ প্রকাশিত অর্ধ শতাধিক গানের মধ্যে শুধুমাত্র ৬টি গান এ তার কথা কিংবা সুর কিংবা অংশ-বিশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যান্ডের সৃষ্টিকে শুধুমাত্র গান গাওয়ার সুবাদে নিজের বলে দাবী করার এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা আমাদের দেশের এমনকি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
শিরোনামহীন এর সদস্যরা বিশ্বাস করে - অসুস্থতা-জনিত বিষণ্ণতা এবং ঔষধ এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় তুহিন এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব এ আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পারেন। আমরা তার সর্বাঙ্গীণ সুস্থতা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করি।
দীর্ঘ ২১ বছরের শিরোনামহীন, মানুষের ভালবাসা কে সঙ্গী করে বহুদূর হেটে চলেছে। সময়ের সাপেক্ষে হোঁচট খেতে হয়েছে, মুখোমুখি হতে হয়েছে বন্ধ জানালার। কিন্তু শিরোনামহীন শত বাঁধা বিপত্তির মাঝেও ঘুরে দাঁড়াতে শিখেছে এবং বিশ্বাস করে যে অনেক মানুষের ভালবাসার শিরোনামহীন থমকে যাবে না। শ্রোতাদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যাবে বহুদূর।’
এর প্রেক্ষিতে ক্রমাগত মন্তব্যের বাণে বিদ্ধ হন শিরোনামহীনের বর্তমান সদস্যরা। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তোপের টার্গেট ছিলেন দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়া। সেখানে সবচেয়ে শালীন মন্তব্যটি ছিলো ইশতিয়াক ইসলাম খান নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারীর। তিনি লেখেন, ‘জিয়া ভাই এই ব্যান্ডের মস্তিষ্ক, ফুসফুস, কিডনি, পাকস্থলি, চোখ, নাক, কান সবকিছু। গানের লেখা বা কম্পোজিশান ওনারই ম্যাক্সিমাম। কিন্তু সবকিছু জিয়া ভাই হলেও জাস্ট হৃদয়ের বাম অলিন্দটা তুহিন। আর সেই অংশটারই ব্যপ্তি এত বিশাল যে তার আড়ালে কয়েক শো মস্তিষ্ক, ফুসফুস, কিডনি হাসিমুখে শহীদ হয়ে যাবে।’
ফারুক প্রধান নামে একজন লিখেছেন, ‘শ্রদ্ধেয় ব্যান্ড সদস্যবৃন্দ, আপনারা যেকোন মূল্যে তুহিন ভাইকে শিরোনামহীন দলে ফিরিয়ে আনুন। সত্যমিথ্যা পরের কথা, তরুণ প্রজন্ম, যারা শিরোনামহীনে বড় হয়েছে তারা তুহিন ভাই ছাড়া এই ব্যান্ডদল কল্পনাও করতে পারে না।’
তৌহিদ রাবেদ লিখেছেন, ‘তুহিনের সিকনেস এর কথা এতোদিন পরে কেনো বললেন? আর এখন ই বা কেনো সুস্থতা কামনা করছেন? এই পেজ থেকে তো এর আগে এমন দায়িত্বশীল কথাগুলো আসেনি!! তুহিন ভাই যা বলসে তার ৫০% ধরলেও আপনারা অপরাধী। এটা খেয়াল রাখবেন শিরোনামহীন ছাড়া তুহিন চলতে পারবে তবে তুহিন ছাড়া শিরোনামহীন পুরো অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে।’
আল মাসুদ নামে একজন শিরোনামহীনের ফেসবুক পেজটিতে ডিজলাইক দিয়েছেন। লাইক দেয়া ও ডিজলাইক দেয়া পেজের দুটি স্ক্রিনশট যোগ করে তিনি পোস্ট করেন ওই স্ট্যাটাসে। ক্যাপশানে লিখেছেন, ‘আপাতত আপনাদের জন্য উত্তর এটাই। বিদায় শিরোনামহীন, বিদায়।’
এদিকে জনপ্রিয় এই ব্যান্ডদলের ভাঙনে সংগীতাঙ্গনেও চলছে তর্ক-বিতর্ক। তবে এক দাবিতে সবাই এক; শিরোনামহীনের যাত্রা শুভ হোক।
প্রসঙ্গত, শিরোনামহীন থেকে সরে গেলেন তানযীর তুহিন সেটি তিনি নিজেই ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি তানযীর তুহীন, ব্যক্তিগত কারণে শিরোনামহীন ব্যান্ড থেকে সরে যাচ্ছি।’ কী কারণে সরে গেলেন সে ব্যাপারে জানিয়েছেন, গত ২১শে সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তুহিন। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি ছিলেন। তার হার্টের রক্তনালীতে ছোট্ট একটা ব্লক পাওয়া গেছে। অস্ত্রোপচার লাগেনি। চিকিৎসক বলেছেন ওষুধেই ঠিক হয়ে যাবে। এক মাস চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে বলেছেন তাকে চিকিৎসক।
তাহলে ব্যান্ড ছাড়ার আসল কারণটা কি? তুহিন বলেন, আমি যখন অসুস্থ, তখন ব্যান্ডের সদস্যদের কাছে বন্ধুত্বের চেয়ে অর্থ মুখ্য হয়ে যায়। তারা একটি শোও মিস করতে চায়নি। ভেবেছে আমি সুস্থ হব না, গান গাইতে পারব না। আমার জায়গায় আরেকজন কণ্ঠশিল্পীকে যুক্ত করে তারা। আমার একটাই প্রশ্ন এক মাস শো না করলে শিরোনামহীন ব্যান্ডের কী এমন ক্ষতি হতো? কিছু টাকা না হয় কম আয় হতো।’ এই অভিমান থেকেই সরে দাঁড়ান তুহিন।

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...