পাহাড়ি জনপদে পানির জন্য হাহাকার

শুকিয়ে গেছে পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়া আর ঝর্ণাগুলো। কোথাও পানি নেই। কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ হেঁটে খাবার পানি আনতে হয়। সারারাত কুয়ায় পানি জমবে আর সকালে যে আগে যাবে সেই পানি নিয়ে ফিরবে।বাকিরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির জন্য অপেক্ষা করবে। বলা হচ্ছে পার্বত্য খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম সীমানাপাড়ার সাধারণ মানুষের পানি দুর্ভোগের কথা।

শুধু সীমানাপাড়া নয় পানির জন্য এমন হাহাকার দীঘিনালার শুকনাছড়া, মাইয়াপো পাড়া, বুদ্ধমা পাড়া ও নয়মাইল এলাকার মানুষের। এসব এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির কাছে এক কলস পানি যেন সোনার হরিণ। সম্প্রতি এসব এলাকা ঘুরে ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের দুর্ভোগের কথা।
এছাড়া কেবল দীঘিনালাই নয় পানছড়ির চেঙ্গী ইউনিয়নের শাম্বুকরায় পাড়া, তক্কীরায় পাড়া, পুস্তরায় পাড়া, দুর্গামুনি পাড়া, শনখোলা পাড়া, ভারতবর্ষ পাড়ার মানুষদেরকেও প্রতিদিন পানির জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ছড়া, ঝর্ণা, কুয়ায় পানি না থাকায় এক কলস পানির জন্য মেয়েদের ভোরে প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পানি না পেয়ে অনেকে খালি কলস ফিরে আসে বাড়িতে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লোগাং, চেঙ্গী ও পানছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পানির সঙ্কট তীব্র হয়ে পড়েছে। ঝর্ণা থেকে ঝরে পড়া এক ফোটা দু’ফোটা করে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে দুর্গম এলাকার মানুষদের।
Water
একই অবস্থা খাগড়াছড়ির মাটিরাঙার তবলছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি পল্লী নতুন ত্রিপুরা পাড়ার। এখানে বসবাসকারী ৫৭টি পরিবারের পানির উৎস একটি মাত্র কুয়া। এই পাড়াতেও নেই কোনো নলকূপ। এ গ্রামের লোকজন গৃহস্থালির কাজ ও খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করেন কুয়ার পানি।
বর্ষার সময় বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হলেও শীত এলে বেড়ে যায় তাদের ‘পানি ভোগান্তি’। মাটিরাঙা উপজেলা সদর থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরের এ গ্রামটিতে কুয়া থেকে অন্তত ৮০০ ফুট ওপরে পাহাড়ে বসবাস পরিবারগুলোর।
সভ্যতার এ যুগেও পার্বত্য খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সীমানা পাড়া, মাইয়াপো পাড়া, বুদ্ধমাপাড়ার মতো অন্যান্য দুর্গম পাহাড়ি জনপদে কোথাও নলকূপ নেই। নেই নিরাপদ পানির বিকল্প অন্য কোনো ব্যবস্থা। এসব এলাকার সকলেই পাহাড়ি ছড়া, ঝর্ণা আর কুয়ার পানি পান করাসহ গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করছে।
এসব পাহাড়ি গ্রামের অধিকাংশ মানুষই জানে না নিরাপদ পানি কী। নদী, ছড়া, ঝিরি, কুয়ার পরিস্কার পানিকেই তারা নিরাপদ পানি হিসেবে জানে। আর এসব পানি পান করার কারণে কলেরা এবং ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এসব দুর্গম জনপদের লোকজন।
সীমানা পাড়া গ্রামের মতিবালা ত্রিপুরা (৪৫) জানান, ছড়া, ঝর্ণাগুলো শুকিয়ে গেছে। এ গ্রামে কোনো নলকূপ নেই তাই অনেক দূর থেকে পানি নিতে এসেছি। তবে এসব পানি পান করার পর ডায়রিয়া, কলেরার মতো রোগ হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন তারপরও এসব পান করতে হয়।
সীমানাপাড়া গ্রামের খমিতা ত্রিপুরা (৫৫) জানান, ছড়া-ঝিরি-কুয়ার পানি পান করেই আমি বড় হয়েছি। এখনো পান করছি। খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে সকল কাজেই এ পানি ব্যবহার করি।
Water
শুকনাছড়ি গ্রামের কার্বারী (গ্রাম প্রধান) সুরেশ বিহারী কার্বারী বলেন, আমাদের পরিবারের সবাই ছড়ার পানি পান করতাম। এক পর্যায়ে পরিবারের মধ্যে আমার শাশুড়ি, স্ত্রী জয়শ্রী চাকমা এবং মেয়ে ইয়ানা চাকমা ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
পানছড়ির বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি পল্লীতে সাধারণ মানুষের পানি দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে লোগাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রতুত্তর চাকমা বলেন, সেখানে পানির স্তর না পাওয়ার কারণেই নলকূপ বসানো সম্ভব হয়না। তবে জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সম্প্রতি কিছু গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে মাটিরাঙার তবলছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম নতুন ত্রিপুরাপাড়ার পানি সঙ্কট সরেজমিনে পরিদর্শন করে জনদুর্ভোগ লাঘবে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন মাটিরাঙা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বি.এম মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, সেখানে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে পানি সঙ্কট লাঘবের সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
তবে দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে নিরাপদ পানির সংস্থান না থাকার কথা স্বীকার করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, সীমানা পাড়া, বুদ্ধমাপাড়া, মাইয়াপো পাড়াসহ দীঘিনালার পাহাড়ি এলাকাগুলোতে আমরা নলকূপ বসানোর চেষ্টা করেছি। নলকূপ বসানোর জন্য কিছু বোরিং করার পর পাথর পাওয়া যায়, ফলে ভালো পানির স্তর পাওয়া যায় না।
পাথর থাকার কারণে এসব গ্রামের কোথাও নলকূপ বসানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব এলাকায় নিরাপদ পানির সংস্থানে সব রকমের চেষ্টা করা হচ্ছে।

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...