১৬ কোটি মানুষের দেশে একমাত্র নারী রিকশাচালক

বাংলাদেশে রিকশা একটি জনপ্রিয় যান। রিকশায় করে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ মেলা ভার। কিন্তু জনপ্রিয় এই যান চালানোটা সত্যিই খুব কষ্টকর। আর নারীদের জন্য রিকশা চালানোর কথাতো চিন্তাই করা যায় না। অথচ এই অসাধ্য সাধন করেছেন মোসাম্মৎ জেসমিন নামের এক নারী। বন্দরশহর চিটাগাংয়ে রিকশা চালিয়ে মানষের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন জেসমিন। ‘পাগলী খালা’ নামেই বেশ পরিচিত তিনি।

কষ্টসাধ্য এই পেশা সম্পর্কে জেসমিন বলেন, ‘আমি এই কাজ করছি কারণ আমি চাই না আমার ছেলেগুলো না খেয়ে থাকুক। আমি চাই তারা একটি ভালো স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক।’ 

তিন সন্তানের এই জননী বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে এক জোড়া হাত-পা দিয়েছেন। আমি ভিক্ষা করতে চাইনা। আমি আল্লাহর এই অশেষ নিয়ামতকে কাজে লাগিয়ে উপার্জন করতে চাই।’

মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের একটি। পাঁচ বছর আগে জেসমিন যখন রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামলেন তার আগে নারীদের রিকশা চালানোর ঘটনা কখনোই দেখা যায়নি।  

স্বামী পরিত্যক্তা জেসমিন তার সন্তানদের মানুষ করতে প্রথম দিকে মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। এরপর একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু কোনো কাজই তার জন্য উপযুক্ত ছিল না। 

৪৫ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা তখনই ভালো যখন আপনি শুধু নিজের কথা ভাববেন। কিন্তু যখন আপনার সন্তানদের কথা ভাবতে হবে তখন এই পেশা আপনার জন্য উপযুক্ত না। আর গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে কাজের তুলনায় বেতন খুবই কম।’ 

সন্তানদের শিক্ষিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন জেসমিন। একদিন এক প্রতিবেশী তার নিজের রিকশাটি জেসমিনকে ধার দেন কিছুদিন চালানোর জন্য। তখনই তিনি এই পেশায় জীবিকা নির্বাহের কথা ভাবতে শুরু করেন।

রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামার পর তাকে অনেক নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। রিকশার প্যাডেল টানাটা যতটা না কষ্টকর ছিল তার চেয়ে বেশি কষ্ট ছিল আশে-পাশের মানুষের কটু মন্তব্য। 

তিনি বলেন, ‘অনেকেই তার রিকশায় উঠতে চাইত না। অনেকেই আবার আজে-বাজে কথা বলত। পুরনো স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমাকে কটু মন্তব্য করে বলত আমি নাকি ছেলেদের কাজ করছি। আবার কেউ বলত, এভাবে ঘুরে ফিরে বেড়ানোর অনুমতি ইসলাম নারীকে দেয়নি। আবার কেউ কেউ তো একজন পুরুষ রিকশা চালককে যে ভাড়া দিত আমাকে তার চেয়েও কম ভাড়া দিতকারণ আমি একজন নারী।’

প্রতিদিন আট ঘণ্টার মতো রিকশা চালিয়ে ৬শ টাকা আয় করেন জেসমিন। এর থেকে কিছু টাকা আবার রিকশার মালিককে দিতে হয়। সপ্তাহের সাতদিনই রিকশা নিয়ে বের হতে হয় তাকে। তবে তার পরিশ্রম আর ধৈয্য এখন তাকে সবার কাছে পরিচিতি এনে দিয়েছে। অন্যান্য পুরুষ রিকশা চালকরাও তাকে সম্মান করতে শুরু করেছেন। প্রতিদিন বাস স্ট্যান্ডে রিক্সা থামিয়ে অন্যান্য রিকশা চালকদের সঙ্গে হাসি বিনিময় করে সবার খোঁজখবর নেন তিনি। তিনি এখন সকলের প্রিয় একজন মানুষ।

তবে গত বছর অটোরিকশা আসায় এখন একটু কষ্ট কমেছে তার। এখন আর আগের মত প্যাডেল টেনে রিকশা চালাতে হচ্ছে না। আর এতে সময়ও অনেকটা বাঁচে। অনেকের কাছেই তিনি এখন অনুপ্রেরণা। আর হবেনই বা না কেন? ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে জেসমিনই যে একমাত্র নারী রিকশা চালক। এটা সত্যিই অনন্য একটি ঘটনা। 

,

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...