প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন ৯ বৃদ্ধ

শিক্ষা গ্রহণের কোনো বয়সসীমা নেই। সেটা আবারও প্রমাণ করলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের ৯ জন বৃদ্ধ। তারা প্রতিনিয়ত সময় ও নিয়ম মেনে স্কুলে আসছেন। নাতি-নাতনির বয়সী শিশুদের সঙ্গে গ্রহণ করছেন প্রাথমিক শিক্ষা। তারা চোখ থাকতে অন্ধ হতে চান না, দিতে চান না টিপসই। তাই শেষ বয়সে এসেও শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা। 

নবাবগঞ্জ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের দারিয়া এলাকায় মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের দোয়েল নামক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করানো হয় প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। ওই শ্রেণিকক্ষে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪১ জন। এদের মধ্যে ৯ জন বৃদ্ধ। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের  প্রথম বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন তারা। তারা নাতি-নাতনির বয়সী ছোট শিশুদের সঙ্গেই অংশ নিচ্ছেন পড়ালেখা, শরীর চর্চাসহ বিভিন শিক্ষা কার্যক্রমে। তারা খুব আগ্রহের সঙ্গেই  ক্লাসে পড়ালেখা করছেন।

ওই ৯ শিক্ষার্থী হলেন- নবাবগঞ্জ উপজেলার আমবাগান এলাকার বাদশা মিয়া (৫০), একই এলাকার বদিয়াজ্জামান (৬২), মাহমুদপুর গ্রামের হারুনুর রশিদ (৫৫), একই এলাকার ইলিয়াস মিয়া (৭০), সিদ্দিক মিয়া (৬৫), আমবাগান এলাকার আসাদ মিয়া (৪৫), মেম্বারপাড়া এলাকার শাহিনুর আলম (৪৬), একই এলাকার আব্দুল লতিফ (৪৮) ও সোনারপাড়া এলাকার লাল মিয়া (৪৬)।

৬২ বছর বয়সী বদিয়াজ্জামান জানান,  স্ত্রী খুব সকালে উঠে খাবার তৈরি করে আর নাতি তাকে বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য ডেকে তোলে। তার নাতিও ওই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ভাত খেয়েই নাতিকে নিয়ে চলে আসেন বিদ্যালয়ে। তারপর দুপুরে ছুটি শেষে আবার বাড়ি ফেরেন। 

তিনি আরও জানান, এই বয়সে বিদ্যালয়ে যেতে পেরে  তিনি খুব খুশি। তেমনি তার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েও খুশি।

৭০ বছর বয়সী ইলিয়াস মিয়া বলেন, অভাবের কারণে ছোট বেলায় লেখাপড়া করতে পারেননি। তাই লেখাপড়া শেখা হয়নি। লেখাপড়া জানা না থাকায় কোরআনের বাংলা অর্থ জানতে সমস্যা হয়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলা শিখবো। পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হলে শিক্ষকরা অতি আগ্রহে আমাকে ভর্তি করে নেন।

হারুনুর রশিদের বয়স ৫৫ বছর। তিনি জানান, এখানে যারা আছেন তাদের সবাইকে পরিবার গরীব থাকায় ছোট থাকতে পড়ালেখা না করে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করতে, ও বাংলা পড়া শিখতে আমরা এখানে ভর্তি হয়েছি। এই বিষয়টি এলাকার লোকজন ভালোভাবে দেখছে, অনেকেই আমাদেরকে উৎসাহ দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, আমাদের দেখে অনেকেই বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ দেখাচ্ছে। আরও কয়েকজন এ স্কুলে ভর্তি হবে বলেও জানান তিনি।

মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহিদুল ইসলাম জানান, প্রথমে দুইজন বৃদ্ধ তার সঙ্গে কথা বলে শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এসময় তিনি জানুয়ারি মাসে তাদের ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। পরে জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনেই একসঙ্গে সাতজন ভর্তি হন। এর তিনদিন পরে ভর্তি হন আরও দুইজন। এখানে মোট ৯ জন বৃদ্ধ শিক্ষা গ্রহণ করছেন। নিয়মিত তারা বিদ্যালয়ে আসছেন এবং তাদের শেখার আগ্রহও অনেক। কিছু না পারলে বা না জানলে শিক্ষকদের কাছে বুঝে নেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জেনাজুল হায়দার জানান, বয়স বেশি হওয়ায় ভর্তি নেয়া যাবে কি না এ বিষয়ে প্রথমে সমস্যা হয়। পরে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করলে শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, ছয় বছরের বেশি বয়সী শিশুকে ভর্তি করার নিয়ম আছে। বয়স বেশি হলে ভর্তিতে কোনো বাধা নেই। তখন ওই বৃদ্ধদেরকে ভর্তি করে নেয়া হয়।

তিনি আরও জানান, এরা সবাই গরীব। তাই সাধারণ শিশুদের মত তাদেরও উপবৃত্তি দেয়ার ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের কাছে জানানো হয়েছে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বজলুর রশীদ জানান, নিরক্ষরতা দূর করতে বয়স্করা স্কুলে আসছে এটি অনেক আশাব্যঞ্জক। তবে সাধারণ শিশুদের সঙ্গে তাদেরকে পাঠদান একটু সমস্যা হতে পারে। এজন্য এই ধরনের বয়স্কদের জন্য আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রাথমিক শিক্ষায় কীভাবে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায় সেটি দেখতে হবে।

,

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...