রাজশাহীতে বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুর, নেই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন

রাজশাহী অঞ্চলে ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে বেওয়ারিশ কুকুর। বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছে মানুষ ও গবাদিপশু। প্রাণী সম্পদ দফতরের হিসেবে, প্রতি বছর শুধুমাত্র রাজশাহীতেই কুকুরের কামড়ের শিকার হয় অন্তত ৫শ’ গবাদি পশু। তবে মানুষ আক্রান্ত হবার সঠিক হিসেব নেই কোথাও।

এছাড়া প্রতিদিন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত প্রায় একশ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। এর বাইরেও বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন আক্রান্তরা। হাসপাতালে ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকায় বাইরে থেকে চড়া দামে তা কিনতে হচ্ছে রোগীদের।

রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স নূর আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রামেক হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে ৫শ জন করে রোগী কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসেন। সে হিসেবে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের চাহিদা পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু বরাদ্দ আসে মাত্র ৫০টি করে। তাও আবার দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনতে হয় আক্রান্তদের।

রামেক হাসপাতালের মেডিকেল স্টোরের হিসেবে, ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে ৫শ চাহিদার বিপরীতে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৫০টি। ওই সময় হাসপাতালে ভ্যাকসিন দেয়া হয় ২৭৯ জনকে। এর ৫১টি সরবরাহ করেছে হাসপাতাল। বাকি ২২৮টি বাইরে থেকে কিনে এনেছেন আক্রান্তরা।

এর আগে নভেম্বরে তিন দফায় ১৫০টি ভ্যাকসিন বরাদ্দ এসেছে। যদিও চাহিদা ছিলো দেড় হাজার। বরাদ্দ আসার আগেই ১০৯ জন বাইরে থেকে ভ্যাকসিন এনে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত অক্টোবরে বরাদ্দ ছিল ২৪১টি, ওই মাসে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৫০ জন। এর মধ্যে ২১৩ জনই বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনেছেন।

এর আগে সেপ্টেম্বরে ২৮৬  এবং আগস্টে ২৬২ জনকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। এর প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করেছে হাসপাতাল।

এদিকে, জেলা হাসপাতালগুলোয় জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন মজুদের জন্য ফ্রিজসহ আনুসঙ্গিক সুবিধা রয়েছে। চিকিৎসার জন্য রয়েছেন চিকিৎসকও। তারপরও মিলছে না রোগী। বিভিন্ন সময় রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব হাসপাতাল থেকে মজুদ করা ভ্যাকসিন এনে সরবরাহ করছে রোগীদের।
 
রামেক হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. আলী আকবর সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন হাসপাতালে তারা চিঠি পাঠিয়ে এন্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন ও এন্টি স্নেক ভেনম ভ্যাকসিন মজুদ বিষয়ে তথ্য চেয়ে নেন। অব্যবহৃত ভ্যাকসিনগুলো নিয়ে আসেন তারা। পরে সেগুলো সময়ের মধ্যেই রোগীদের সরবরাহ করা হয়। চাহিদা মাফিক এসব ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই বলে জানান তিনি।

রাজশাহীর স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক ডা. আব্দুস সোবাহান বলেন, কুকুর, বিড়াল বা শিয়ালের কামড় এমনকি আঁচড় থেকে জলাকতঙ্ক ছড়ায়। এটি প্রাণঘাতি জুনোটিক রোগ। এজন্য পাগলা কুকুর মেরে ফেলার বিকল্প নেই। মানুষ আক্রান্ত হলে অবশ্যই জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন নিতে হবে। এছাড়া বেওয়ারিস কুকুর নিয়ন্ত্রণসহ সচেতনতা বাড়ানো দরকার।

তবে বর্তমানে বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভেটেরেনারী সার্জন ড. ফরহাদ উদ্দিন।

তিনি বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় উচ্চ আদালতে কুকুর নিধন বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে ২০১০ সাল থেকে। এরপর থেকেই বেওয়ারিশ কুকুর বেড়েই চলেছে। ওই বছরই সর্বশেষ নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ২শটি করে মোট ছয় হাজার বেওয়ারিস কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। এরপর থেকেই বন্ধ এ কার্যক্রম।

তবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও নিরাপদ স্বাস্থ্য রক্ষায় মালিকদের কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়ার তাগিদ দিচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে নিবন্ধনও নিতে বলা হয়েছে। নিবন্ধন না নিলে বেওয়ারিশ ধরে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জনস্বার্থে গত ২৩ অক্টোবর স্থানীয় সংবাদপত্রে এনিয়ে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়।

তিনি আরো বলেন, জলাতঙ্ক ঠেকাতে কুকুরকে আগে ভ্যাকসিন দেয়া হলেও এখন বন্ধ রয়েছে। নতুন করে চালুর বিষয়টিও ভাবছেন তারা। এনিয়ে মন্ত্রণালয়ে কয়েকবার চিঠি চালাচালিও হয়েছে। শিগগিরই এবিষয়ে কার্যক্রম শুরু হবে।

জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেজাউল ইসলাম বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো এনিয়ে তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলের দু-একটি জায়গায় কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। এর অধিকাংশই মালিকানাধীন কুকুর। প্রতি ডোজ ২৫ টাকা করে নিয়ে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে।

তবে বেওয়ারিক কুকুরকে ভ্যাকসিন দেয়ার বিষয়টি থমকে রয়েছে আর্থিক জটিলতায়। কিভাবে এর অর্থায়ন হবে সেটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে কথাবার্তা চলছে। সম্প্রতি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনাও হয়।

খুব শিগগিরই এনিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। এরপর প্রতিটি জেলা পরিষদ, জেলা প্রাণী সম্পদ দফতর ও জেলা সিভিল সার্জন দফতর এ কার্যক্রমে একযোগে মাঠে নামবে।

কুকুর বন্ধ্যাকরণ প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় মালিকদের ভ্যাকসিনে আগ্রহী করতে প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান বিভাগীয় প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা। 

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...