সংকটে মালয়েশিয়ার রাজনীতি

বহু জনগোষ্ঠীর দেশ মালয়েশিয়া। দেশটিতে রয়েছে মালয়, চীন, ভারতীয়সহ নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ। সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এক হয়ে মালয়েশিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে গঠিত হয়েছে বার্সিহ রাজনৈতিক দল। এ দল গঠনে আধুনিক মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন উওপ্ত হয়ে উঠেছে। দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোটেও।

এমনিতেই ওয়ানএমডিবি বিতর্কে বেকায়দায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। অনেকে এ বিতর্কেই তার রাজনীতির ইতি দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, শুধু নাজিব রাজাকই নন, রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে পুরো মালয়েশিয়াই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় নাজিবের আগে আর কোনো প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকাকালে এভাবে বিতর্কে জড়াননি। কোনো প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভে উত্তালও হয়নি দেশ। কিন্তু এবার হয়েছে। গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানী কুয়ালালামপুরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ডাক দেয় নাজিববিরোধী জোট। এরই ধারাবাহিকতায় ২৯ ও ৩০ আগস্ট এবং চলতি মাসের ১৯ নভেম্বর মারদেকা অভিমুখে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।

সমালোচকরা বলছেন, সরকার বিরোধী আন্দোলনে সত্যিই বেশ চাপে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার ওপর এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে সম্প্রতি পিপিবিএম নামে নতুন দল গঠন করেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ড. মাহাথির মোহাম্মদ।

দেশটির সরকার প্রধানের দুর্নীতির অভিযোগ এনে রাজপথে নামায় নাজিবের অবস্থান আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী জোট উভয়ের মধ্যেই দিনে দিনে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠছে। তাদের মতে, এ দ্বন্দ্বের চরম প্রকাশ ঘটতে পারে ২০১৮ সালের নির্বাচনে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতাসীন দলে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত মূলত ২০১৩ সালের নির্বাচন থেকেই। ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর এখন পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় আছে ইউএনএমও। এর আগে কখনও জনপ্রিয়তায় ভাটা না পরলেও ২০১৩ সালের নির্বাচনে দলটিকে তা দেখতে হয়েছে।

নির্বাচনের পরপরই দলের মধ্যে শুরু হয় গুঞ্জন। দলের কোনো কোনো সদস্য মনে করেন, নাজিব রাজাকের পরিকল্পনায় ও পদক্ষেপে ত্রুটি থাকাতেই এমন দিন দেখতে হচ্ছে তাদের। অনেকে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী জোটের কাছে হেরে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন।

এই গুঞ্জন চলার মাঝেই গত বছর জুলাই মাসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত হয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এতে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়া ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তোলা হয়।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওয়ানএমডিবি ফান্ড থেকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন রিংগিত (৫ হাজার ১৮৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা) জমা হয়েছে। এরপর থেকেই ইউএনএমও-তে নাজিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেন অনেক নেতা। অবস্থা বেগতিক দেখে মন্ত্রিপরিষদ রদবদলের নামে গত বছরের ২৮ জুলাই তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী মুহিদ্দিন ইয়াসিনকে বরখাস্ত করেন। তার এ পদক্ষেপ দলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কারণ মুহিদ্দিন ইয়াসিন ইউএনএমওর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পাশাপাশি দলের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় একজন নেতা ছিলেন। নাজিবের উত্তরসূরি মনে করা হতো তাকে।

এদিকে, চলতি মাসের ১৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রী নাজিব বিন রাজাকের  পদত্যাগ চেয়ে  নতুন পার্টির নেতৃত্বে ফের  মাঠে নামেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দায় নিয়ে নাজিবের পদত্যাগ করা উচিত এবং তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চায় না বলে দাবী জানান মাহাথির।

বার্সিহ আন্দোলনে যোগ দিয়ে নাজিবের বিরুদ্ধে ড. মাহাথির মোহাম্মদ যে অভিযোগ তুলেছেন, তা ব্যাখ্যা করতে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হয়েছেন মাহাথির। এতে সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ জনগণের মধ্যে আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথিরের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে।

এসব ঘটনায় মাহাথির-মুহিদ্দিনসহ ইউএনএমও’র যে নেতারা নাজিবের ওপর নাখোশ হয়ে পিপিবিএম নতুন দল গঠন করায় মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে রীতিমত বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম পরবর্তীতে ইউএনএমও থেকে বেরিয়ে পিপল’স জাস্টিস পার্টি (পিকেআর) গঠন করেন। এরপর বাকি দুই বিরোধী দল প্যান-মালয়েশিয়ান ইসলামিক পার্টি (পিএএস) ও ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টিকে (ডিএপি) নিয়ে তিনি বিরোধী জোট পাকাতান রাকায়েত (পিআর) গঠন করেন। কিন্তু পুরুষকামীতার কারণে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের জেল হয় আনোয়ার ইব্রাহিমের। তার এ অনুপস্থিতিতে ধীরে ধীরে বন্ধন হাল্কা হতে শুরু করেছে জোটে।

পিএএস ও ডিএপি’র আদর্শগত পার্থক্যকে এর মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পিএএস মালয়েশিয়ার একটি ইসলামিক রাজনৈতিক দল, আর ডিএপি হলো মধ্যবামপন্থি দল। এই আদর্শগত পার্থক্যের কারণে দল দু’টোর মধ্যে সম্পর্কে শীতলতা নেমে এসেছে। এর ফলে কার্যত বিরোধী জোট পাকাতান রাকায়েত বলতে গেলে নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়ার রাজনীতি এমন এক অধ্যায়ে ঢুকতে চলেছে, যার বর্ণনা শুধু ভবিষ্যতই দিতে পারবে। ক্ষমতাসীন দলে কিংবা বিরোধী জোটে দ্বন্দ্বগুলো এমন এক সময় চলছে যখন পরবর্তী নির্বাচন থেকে মালয়েশিয়া মাত্র দুই বছর দূরে রয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে যাই ঘটুক, তাতে বর্তমানে রাজনীতিতে চলমান দ্বন্দ্বই যে মুখ্য ভূমিকা রাখবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে মালয়েশিয়া তার সামনে এগিয়ে যাওয়াটা কি ধরে রাখতে পারবে?

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...