বিএনপির সাবেক মেয়র মনজুর ফিরলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে


বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ফিরলেন বিএনপির সাবেক মেয়র মনজুর

চট্টগ্রাম: আমৃত্যু পিতা ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। তিনি নিজেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে তিনবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাঝে অভিমান করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মেয়র পদে মনোনয়ন পেয়েছিলেন, নির্বাচিতও হয়েছিলেন। গত বছরের ২৮ এপ্রিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন বিএনপির রাজনীতিকে বিদায় জানান তিনি। এক বছরের মধ্যে আবারও মিশে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আদর্শের সঙ্গে। তিনি সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম, মিষ্টভাষী, সজ্জন হিসেবে যার পরিচিতি চট্টগ্রামে।
এবছর নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলতুন্নেছা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন’র ব্যানারে এম মনজুর আলম পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১ তম শাহাদাতবার্ষিকী। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দু:স্থদের মাঝে বস্ত্র ও খাবার বিতরণ করা হয়।
সোমবার সকালে নগরীর উত্তর কাট্টলী বাগানবাড়িতে খতমে কোরআন, দোয়া, মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সাবেক মেয়র মো. মনজুর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তারই ভাতিজা আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মো. দিদারুল আলম।
আকবর শাহ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলতান চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক কাজী আলতাফ, সীতাকুন্ড উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন ছাবেরী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল বাকের ভূইয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অবশ্য এম মনজুর আলম যখন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন, তখনও মেয়র হিসেবে ১৫ আগস্ট শোক দিবস উদযাপন করেছেন। পরিচালনা করেছেন ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলতুন্নেছা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন’।
১২ বছর আগে ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছেন জানিয়ে এম মনজুর আলম বলেন, ‘আমি এই সংগঠনের ফাউন্ডার এবং নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি। সভাপতি হিসেবে আছেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম  মহিউদ্দিন চৌধুরী।’
বঙ্গবন্ধুকে মনেপ্রাণে ধারণ করেন উল্লেখ করে মনজুর আলম বলেন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে আমার মায়ের মর্যাদা দিয়েছি। আগামী প্রজন্মও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করবে।

আগামী বছর থেকে ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ঢাকায় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হবে বলেও জানান তিনি।
পিতা থেকে পরবর্তী চতুর্থ প্রজন্ম পর্যন্ত সবাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ বলে জানালেন এম মনজুর আলম।
‘আমার বাবা আমৃত্যু আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। আমিও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। দলের হয়েই কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছি। বর্তমানে আমার ভাতিজা সংসদ সদস্য। আমার ১১ বছরের এক নাতি শেখ রাসেল জাতীয় শোক দিবস উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক। আমাদের পুরো পরিবার আওয়ামী রাজনীতি সঙ্গে জড়িত এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী।’ বলেন এম মনজুর আলম।
ফের আওয়ামী লীগে ফিরেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফিরে আসা নয়, আমি যেখানে গিয়েছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেছি। বিএনপির মেয়র থাকা অবস্থায়ও জাতীয় শোক দিবস পালন করেছি। বঙ্গবন্ধুকে সম্মানের ক্ষেত্রে কোন কার্পণ্য ছিল না। কারণ রাজনীতি আলাদা বিষয়, বঙ্গবন্ধু সবার উর্ধ্বে।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এম মনজুর আলমের বাবা আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টর স্বাধীনতার আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্বাধীনতার পরে উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। আমৃত্যু ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য। নিজের অবস্থান থেকে দলের জন্য কাজ করে গেছেন।
নগরে আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে নিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল,  যা আজও স্মরণ করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। প্রয়াত আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টরের মৃত্যুবার্ষিকীতে উপস্থিত থাকেন নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। গত ১০ জুন অনুষ্ঠিত ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
স্মরণ সভায় মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন,‘মরহুম আবদুল হাকিম কন্ট্রাক্টর সমাজসেবা ও রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নগরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে ঘরে ঘরে গিয়ে কর্মী সংগ্রহ করেছেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন নির্লোভ ও নিবেদিত প্রাণ। প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রাপ্তি প্রত্যাশা করেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি মনেপ্রাণে ধারণ করেছিলেন।’
যে কারণে বিএনপি ছাড়েন মনজুর:
আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিশ্বস্থ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ১৮ বার পালন করেছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হলে টানা দুই বছর ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২০১০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল থেকে মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন চান। কিন্তু এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। তখন বিএনপি থেকে মনজুর আলমকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে।
প্রায় দুই লাখ ভোটের ব্যবধানে শিষ্য মনজুরের কাছে পরাজিত হন তিনবারের মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। নির্বাচিত হওয়ার পর দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করেন মনজুর আলম। এর কিছুদিন পর তাকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা করা হয়। মেয়র হিসেবে ভাল মানুষ পরিচিতি পেলেও দলীয় কর্মকান্ডে সক্রিয় না থাকায় অসন্তোষ ছিল বিএনপিতে। তবে পাঁচ বছরে  দলে আর্থিক সহায়তা দিয়ে গেছেন মনজুর আলম। এরপরও তাকে বিএনপি নেতাদের নানা ধরনের অভিযোগ-অনুযোগ শুনতে হয়েছে নিয়মিত।
ফলে একদিকে রক্তে মিশে থাকা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অন্যদিকে বিএনপি নেতাদের নেতিবাচক মনোভাবে মনজুর আলমের কাছে রাজনীতি বিরক্তিকর হয়ে উঠে। দলের জন্য অনেক কিছু করেও প্রশংসা না পাওয়ায় কষ্ট পেয়েছেন।
এরপরও ২০১৫ সালে বিএনপি থেকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। কিন্তু নির্বাচনে প্রতি পদে পদে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাকে এবং তার পরিবারকে। চট্টগ্রাম বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হয়েছে আর্থিক ও মানসিকভাবে। ফলে তখনই বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে খুব কৌশলে নির্বাচনের দিন সকাল ১১টার দিকে নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দেন মনজুর আলম। এসময় তিনি ভারাক্রান্ত মন ও অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেও রাজনীতি ছাড়ার কোন কারণ ব্যাখ্যা করেননি।
গুরু এখনো মহিউদ্দিন:
রাজনৈতিক গুরু এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে চট্টগ্রাম সিটি মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন এম মনজুর আলম। ভোটের কারণে দল পরিবর্তন করলেও গুরুভক্তি ছিল শতভাগ। ফলে মেয়রের আসনে বসে মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেওয়া কোন সিদ্ধান্তকে তিনি অবমূল্যায়ন করেননি। বরং যথাসম্ভব সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বিশ্বস্ত মানুষগুলো দূরে সরে যাওয়ার কারণেই মহিউদ্দিন চৌধুরী কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে মনে করেন তারই বিশ্বস্ত শিষ্য এম মনজুর আলম। তবে তার মতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিকল্প কোন নেতা নেই।
মহিউদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে মনজুর আলম বলেন, ‘উনি(মহিউদ্দিন চৌধুরী) অনেক সময় একটু রেগে কথা বলেন। কিন্তু মানুষকে অত্যন্ত ভালবাসেন। বকা দিলেও যে কোন কাজ তিনি করে দেন। সারাজীবন কেবল মানুষের উপকারই করেছেন। উনার মত দেশ প্রেমিক দ্বিতীয় কোন রাজনীতিবিদ চট্টগ্রামে নেই। ’

, ,

0 মন্তব্য(গুলি)

Write Down Your Responses

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...